প্লাটিলেট নয়, ডেঙ্গুতে শঙ্কার কারণ শক সিনড্রোম
ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত জ্বর, যা এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেশিরভাগ মানুষ ডেঙ্গু হলে প্লাটিলেট নিয়ে শঙ্কিত থাকেন। ওষুধ খাওয়া ও চিকিৎসকের কাছে সঠিক সময়ে শরণাপন্ন হওয়া নিয়েও নানা বিভ্রান্তিতে থাকতে হয়।
ডেঙ্গু ধরন
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ডেঙ্গু চার ধরনের। ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। একেক সময় একেক ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। দেশে প্রথম ২০০০ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। প্রতি বছরই ২/৩টি ধরনের সক্রিয়া থাকে। ২০১৯ সালে ডেন-৩ এর বেশি সংক্রমণ দেখা দেয়। এবারও ডেঙ্গুর ধরন ডেন-৩’র প্রাদুর্ভাবটাই বেশি। এসব ধরনের আবার লক্ষণও সব সময় এক থাকে না।
ডেঙ্গু আক্রান্তদের জটিলতা
ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে প্লাজমা লিকেজ হয়। সার্কুলেশন থেকে তরল পদার্থ (প্লাজমা) বের হয়ে পেটে জমা হয়, ফুসফুসের চারপাশে জমা হয়। তখন রোগীর রক্তচাপ কমে যায়, শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হয়। এটাকে বলে ডেঙ্গু শকড সিনড্রোম। রোগী শক সিনড্রোমে চলে গেলে ভালো হতে সময় লাগবে।
এ ছাড়া প্লাটিলেট কমে যায়। প্লাটিলেট কমার জন্য ডেঙ্গু রোগীর খুব বেশি সমস্যা হয় না। প্লাটিলেট অনেক কমে গেলে রক্তক্ষরণ বেশি হয়। কারও ব্রেনে ব্লিডিং হলে স্ট্রোক হয়। এ ছাড়া আরেকটি চিত্র হলো এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম, অর্থাৎ ডেঙ্গু হওয়ার জন্য মেজর অর্গানগুলোতে জটিলতা তৈরি হয়। যেমন- কিডনি, লিভার, ব্রেন ও হার্টে সমস্যা হয়। এ ছাড়া রক্ততে কিছু সমস্যা হতে পারে। ডেঙ্গু রোগী অনেক বেড়ে গেলে জটিলতা বাড়বে, মৃত্যু হার বাড়বে, একটা ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হবে।
কখন ডেঙ্গু পরীক্ষা করবেন
ডেঙ্গুর মৌসুমে জ্বর হলেই জ্বরের দ্বিতীয় দিনে এনএস-ওয়ান ও সিবিসি পরীক্ষা করালে বোঝা যাবে রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত কিনা।
হাসপাতালে ভর্তি
বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের গাইড লাইন অনুসরণ করে রোগী হাসপাতালে ভর্তি হবেন। এখানে সব বলা আছে। রোগীর অনেক বেশি বমি হলে, পেটে ব্যথা থাকলে, শরীরে কোনো জায়গা থেকে রক্তক্ষরণ হলে, বেশি দুর্বল লাগলে হাসপাতালে ভর্তি করা লাগবে। এ ছাড়া বয়স্ক, গর্ভবতী, লিভারের সমস্যায় আক্রান্ত, কিডনি রোগী, হার্টের রোগীরা ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে হাসপাতালে ভর্তি হবেন।
প্লাটিলেট কমলে ব্লাড দেয়া জরুরি?
প্লাটিলেট কমলে ব্লাড দেওয়ার একদমই প্রয়োজন নেই। প্লাটিলেট কাউন্ট নিয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই। প্লাটিলেটের স্তর ১০ হাজারের নিচে না নামলে ভয়ের কিছু নেই। আতঙ্কিত হওয়ারও কিছু নেই। অনেকের প্লাটিলেট নরমাল, কিন্তু অস্বাভাবিক কিছু ব্লিডিং হয়। এমন পরিস্থিতিতেও প্লাটিলেট নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই।
প্লাটিলেট কাউন্টের গুরুত্ব
প্লাটিলেট হলো একটি রক্তকণিকা। রক্তকণিকা রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। রক্ত কণিকা বা প্লাটিলেট কমে গেলে শরীরের যেকোনো জায়গা থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এই রক্তক্ষরণ দাঁতের গোড়া থেকে হয়, আবার চামড়ার ভিতরে লাল দাগ হয়, কারো বমির সাথে রক্ত যায়, পায়খানার সাথে রক্ত যায়। প্লাটিলেট কমে গেলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট নিয়ে বেশি শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, বরং শক নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
ডেঙ্গুতে কি কি ওষুধ খাওয়া যাবে না
ডেঙ্গু আক্রান্তদের শরীর ব্যথা কমাতে কোনো ওষুধ খাওয়ানো যাবে না। ডেঙ্গুতে ব্যথার ওষুধে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অনেকে প্লাটিলেট বাড়াতে পেপের রস খায়। কিন্তু এ ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক কোনো তথ্য নেই। অযথা কোনো ওষুধ খাওয়ারই প্রয়োজন নেই।
চিকিৎসকের শরণাপন্ন
এ ব্যাপারে প্রথমে বলবো, প্রাদুর্ভাবের এ সময়ে ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষা পেতে সচেতন হতে হবে। এরপর ডেঙ্গুর মৌসুমে জ্বর হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। তখন তিনি জানাবেন রোগী ডেঙ্গুর কোন ধরনটিতে আক্রান্ত। রোগীকে চিকিৎসকই জানাবেন হাসপাতালে কখন ভর্তি হতে হবে। তবে ডেঙ্গু রোগী ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া হাসপাতালে ভর্তি হবেন না।